Shahabuddin sir - western political thought: modern Period

 Q1. Reformation movement কী? এর প্রেক্ষাপট

রিফরমেশন আন্দোলন: পরিচিতি

রিফরমেশন আন্দোলন বা প্রোটেস্ট্যান্ট রিফরমেশন (Protestant Reformation) ছিল ১৬ শতকের ইউরোপে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এটি রোমান ক্যাথলিক চার্চের বিভিন্ন বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান, এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে শুরু হয়। এই আন্দোলনের ফলাফল হিসেবে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মের সূচনা হয় এবং ইউরোপের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।

রিফরমেশন আন্দোলনের সংজ্ঞা:

রিফরমেশন হলো এমন একটি আন্দোলন, যার মাধ্যমে রোমান ক্যাথলিক চার্চের ধর্মীয় ও প্রশাসনিক দুর্নীতির সমালোচনা করে খ্রিস্টান ধর্মের একটি নতুন শাখা—প্রোটেস্ট্যান্টিজম (Protestantism)—উদ্ভব হয়। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন মার্টিন লুথার, জন ক্যালভিন, এবং অন্যান্য ধর্মীয় চিন্তাবিদ।

রিফরমেশন আন্দোলনের প্রেক্ষাপট

রিফরমেশন আন্দোলনের পেছনে ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক, এবং সাংস্কৃতিক কারণ।

১. ক্যাথলিক চার্চের দুর্নীতি:

  • মধ্যযুগের শেষে রোমান ক্যাথলিক চার্চ ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। কিন্তু চার্চের ভেতরে ছিল ব্যাপক দুর্নীতি।
  • বিশেষত, ‘ইনডালজেন্স’ (Indulgences) বা পাপমুক্তির সনদ বিক্রি ছিল মানুষের মধ্যে অসন্তোষের অন্যতম কারণ।
  • পাদ্রিরা চার্চের ক্ষমতা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করতেন।

২. ধর্মীয় মতবিরোধ:

  • চার্চের শিক্ষার সাথে অনেক ধর্মতত্ত্ববিদের দ্বিমত ছিল।
  • তারা বিশ্বাস করতেন, চার্চের আচার-অনুষ্ঠান ও মধ্যস্থতা ছাড়াই মানুষের ঈশ্বরের সাথে সরাসরি যোগাযোগের অধিকার রয়েছে।

৩. ছাপাখানার আবিষ্কার:

  • ১৪৫০ সালে ছাপাখানা আবিষ্কার হয়, যা তথ্য ও চিন্তাভাবনা দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
  • মার্টিন লুথারের "৯৫ থিসিস" এবং অন্যান্য ধর্মীয় মতবাদ ইউরোপজুড়ে ছাপাখানার মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

৪. রেনেসাঁসের প্রভাব:

  • রেনেসাঁস মানবতাবাদ এবং যুক্তিনির্ভর চিন্তাধারার প্রসার ঘটায়।
  • মানুষ ধর্মীয় বিষয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং প্রশ্ন করার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।
  • প্রাচীন গ্রিক ও রোমান গ্রন্থের পুনরুদ্ধার ধর্মীয় শিক্ষার বিকল্প ব্যাখ্যা সামনে নিয়ে আসে।

৫. রাজনৈতিক পরিস্থিতি:

  • অনেক ইউরোপীয় রাজা এবং শাসক রোমান ক্যাথলিক চার্চের আধিপত্যে বিরক্ত ছিলেন।
  • তারা চার্চের ক্ষমতা হ্রাস করে নিজের রাজ্যের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চাইতেন।

৬. আর্থ-সামাজিক কারণ:

  • মধ্যযুগের শেষে ইউরোপের সমাজে আর্থিক বৈষম্য বাড়তে থাকে।
  • চার্চের কর আরোপ এবং সম্পদের অপব্যবহার সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।

রিফরমেশন আন্দোলনের সূচনা

মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে শুরু:

  • ১৫১৭ সালের ৩১ অক্টোবর, মার্টিন লুথার তার “৯৫ থিসিস” উইটেনবার্গ চার্চের দরজায় টাঙিয়ে দেন।
  • এতে তিনি চার্চের ইনডালজেন্স বিক্রির নিন্দা করেন এবং বলেন, পাপমুক্তি কেবল ঈশ্বরের করুণা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে সম্ভব।
  • এটি রিফরমেশন আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

উপসংহার

রিফরমেশন আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ধর্মীয় দুর্নীতি, রেনেসাঁসের যুক্তিনির্ভর চিন্তাধারা, এবং ইউরোপের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এটি শুধু ধর্মীয় পরিবর্তন নয়, ইউরোপের সামাজিক, রাজনৈতিক, এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছিল।

Q2.   Reformation movement এ Luther এর অবদান আলোচনা করো

ইউরোপে ধর্মসংস্কার আনন্দলনের সূত্রপাত হয়েছিল জার্মানিতে মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে। 1517 খ্রীষ্টাব্দে রোমান ক‍্যাথলিক চার্চের  আর্থিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশেষ করে Indulgence বা ক্ষমাবিক্রয়পত্রের তীব্র সমালোচনা করেন। দুপক্ষের এই বাদানুবাদ সংস্কার আন্দোলনে পরিণত হয়। লুথার পোপতন্ত্রের সমালোচনা করলেও রাজশক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাষ্ট্র ও পোপের মধ‍্যকার দ্বন্দ্ব ধর্মসংস্কার আন্দলনের পক্ষে লাভজনক হয়েছিল।

15 শতকের শেষ দিকে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মানবতাবাদী পণ্ডিতদের সমাবেশ ঘটতে থাকে। উচ্চশিক্ষায় ছাত্রসংখ‍্যাও বাড়ছিল। একই সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারও ঘটেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে  নতুন চিন্তা ভাবনার জোয়ার সমাজের নিম্নতর স্তরেও পৌঁছে যাচ্ছিল। ফলে সমাজে বিশেষত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ‍্যে ধর্মীয়  জীবনে কিছু সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়ে ছিল।

সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্তিতি ধর্মসংস্কার আন্দোলনকে তরাণ্বিত করেছিল। জার্মানিতে লুথার যখন র্মাজনা পত্র বিক্রয়কে আক্রমণ করলে তখন যাজক সম্প্রদায়ের মধ‍্যে যে বির্তকের সূত্রপাত হয়, তাকে দুটি ভিন্নধর্মী মতার্দশের ভিতরকার সংঘাত হিসাবে ধরা হয়েছিল। কিন্তু অল্পদিনেই মতাদর্শগত সংঘাত রাজনৈতিক আন্দলনে পরিণত হয়। উওর জার্মানির কৃষকরা যে বিদ্রোহ করেছিল তা শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অনাচারের বিরুদ্ধে নয়, সামাজিক নিষ্পেশনের বিরুদ্ধেও, যা রাজশক্তিকে উদ্বিগ্ন করেছিল। রাজশক্তি এই বিদ‍্রোহ দমন করে ছিল। কিন্তু এর পর থেকে সংস্কার আন্দোলনের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চেয়েছিল। তাই লুথারপন্থী প্রতিবাদ গুলিকে রাজা সমর্থন করেছিল, যাতে গণবিদ্রোহের সম্ভাবনা এড়ানো যায়। লুথারবাদ জার্মানিতে স্বীকৃতি পেয়েছিল এবং এর ফলে এক ধর্মকেন্দ্রীক রাজনৈতিক বিভাজনের সূচনা হয়েছিল।

লুথারের মতবাদের মূল কথা দুটি 1) সবাই নিজেই নিজের পুরোহিত, এবং 2) ঈশ্বর বিশ্বাসই হল মুক্তির একমাত্র পথ। তিনি বলতেন মন্দ প্রেতাত্মা সতত চারিদিকে ঘুরে বেরায় এবং মানুষকে কুপথে চালিত করে। লুথার এক অন্তহীন পাপবোধে আচ্ছন্ন ছিলেন। দৈব ও মানবজীবণ সম্পর্কে  তার ভাবনা ছিল পরস্পর বিরোধী। তার মতে মানুষ  প্রাথমিক কর্তব‍্য ছিল ঈশ্বরের অনুগমন করা। আবার তিনি বলছেন মানুষ জীবণের প্রয়োজনে ঈশ্বর থেকে বিচ্ছন্ন এবং  যুক্তিনির্ভর আর যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরকে পাওয়া  যায় না। লুথার এই ঈশ্বর ও মানবের বিচ্ছিন্নতা দূর করতে চেয়েছিলেন। তার মতে ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে সেতুর কাজ করে ঈশ্বর বিশ্বাস। ঈশ্বরের প্রতি নিসংশয় বিশ্বাস থাকলেই মানুষের মুক্তি সম্ভব। ঈশ্বর বিশ্বাসীদের ধর্মীয় আচার আচরণের প্রয়োজন হয়না। ঈশ্বর বিশ্বাসের উৎপত্তি যেহেতু বাইবেল তথা ঈশ্বরের বাণী, তাই বাইবেলের বাণী প্রচার করেই মানুষকে ঈশ্বর বিশ্বাসী করা সম্ভব। 

তিনি আরো বলেন খ্রীষ্টানরা ( সেই সময় ) বাইবেল থেকে বিচ্ছিন্ন। পোপতন্ত্র ঈশ্বরের সৃষ্টি নয়। ভালো কাজ করলেই ঈশ্বর পাওয়া  যায় না, ভালো মানুষ  হতে হয়। আর একজন ভালো মানুষের মুক্তির জন্য  পুরোহিতের দরকার হয় না, সে নিজেই নিজের পুরোহিত। এইজন‍্যই মার্জনা পত্র কিনে মুক্তির পথ খোঁজা অবান্তর।

লুথারবাদের উৎপত্তি রাষ্ট্র ও চার্চের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছিল। লুথার বললেন দূনীতি গ্রস্থ চার্চেকে নিয়ন্ত্রণ করার পূর্ণ অধিকার শাসকের আছে। এইভাবে তিনি প্রোটেস্ট‍্যান্ট আন্দোলনকে রাষ্ট্রপক্ষীয় করে তোলেন। কারণ প্রোটেস্ট‍্যান্ট আন্দোলনকে রক্ষা করতে গেলে আঞ্চলিক রাষ্ট্রশক্তির সমর্থন অপরিহার্য ছিল। An Appeal to  the Christian Nobility of the German Nation পুস্তিকায় রাজন‍্যবর্গকে ক‍্যাথলিক চার্চ ধ্বংস করার আহ্বান করেছিলেন।


ধর্মসংস্কার আন্দোলনে মার্টিন লুথারের ভূমিকা 

১. বাইবেল অনুবাদে অনুপ্রেরণা : 

উইলিয়াম ওকামের চিন্তাধারার দ্বারা লুথারের ধর্মীয় ভাবনা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। সাধু অগাস্টিনের বাণী “বিশ্বাসে ভগবানের আর্শীবাদ মেলে”—লুথারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। জ্ঞান ও বিশ্বাস অর্জনের জন্য শাস্ত্র পড়ার লক্ষ্যেই নিজ নিজ ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ প্রয়োজন —লুথার এই বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত হয়ে বাইবেলের অনুবাদে উৎসাহ জোগান। তিনি জার্মান ভাষায় ল্যাটিন বাইবেলের অনুবাদ করেন।

২. ধর্মীয় অনাচারের প্রতিবাদ :

প্রচলিত খ্রিস্টধর্মের শোচনীয় অবস্থা দেখে লুথার গভীরভাবে ব্যথিত হন। খ্রিস্টধর্মের এবং গির্জার বিভিন্ন অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি সরব হন। এ ব্যাপারে প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেন। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয় ভেবে তিনি রোমে গিয়ে (১৫১০ খ্রি.) পোপের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং যাবতীয় ধর্মীয় অনাচার ও দুর্নীতি দূর করার জন্য পোপকে অনুরোধ জানান। কিন্তু পোপ তাঁর আবেদনে সাড়া দেননি।

৩. মার্জনাপত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ : 

১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে যাজক টেটজেল রোমের ‘সেন্ট পিটার্স গির্জা’ সংস্কারের নামে অর্থ সংগ্রহ করতে শুরু করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি উত্তর জার্মানির স্যাক্সনিতে ইন্ডালজেন্স বা মার্জনাপত্র নামে পাপমুক্তির ছাড়পত্র বিক্রি করতে শুরু করেন। লুথার এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি সে সময়ের রীতি মেনে উইটেনবার্গ গির্জার দরজায় ৯৫ দফা অভিযোগ সংবলিত এক প্রতিবাদপত্র টাঙিয়ে দেন। লুথার প্রচার করেন—“মানুষ তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারে অনুতাপের মাধ্যমে, পোপের কাছ থেকে মার্জনাপত্র কিনে পাপমোচন করা যায় না।"

৪. প্রতিবাদী খ্রিস্টধর্মের প্রতিষ্ঠা : 

সে সময়কার অনাচার ও ভ্রষ্টাচারে ডুবে থাকা ক্যাথোলিক ধর্মপ্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যমে লুথার তাঁর মতবাদ প্রচার করেন। তাই তাঁর মতবাদ ‘প্রতিবাদী খ্রিস্টধর্ম’ বা ‘প্রোটেস্ট্যান্টবাদ’ নামে পরিচিত। তিনি ‘ব্যাবিলনীয় দাসত্ব’ ও ‘জার্মানজাতির খ্রিস্টান অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রতি আবেদন’ নামে দুটি গ্রন্থে পোপের প্রাধান্য, যাজকদের ঈশ্বর কর্তৃক নিযুক্তি এবং ধর্মাধিষ্ঠানে যাজকদের প্রাধান্য অস্বীকার করেন।

৫. পোপের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ : 

লুথার পোপ ও গির্জার প্রতি তীব্র জেহাদ ঘোষণা করেন। বাইবেলের ব্যাখ্যাকার পোপের চূড়ান্ত কর্তৃত্বকে লুথার চ্যালেঞ্জ জানান। এ ছাড়া তিনি পোপ কর্তৃক ধর্মীয়.কর সংগ্রহেরও বিরোধিতা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পোপ দশম লিও লুথারকে ‘নাস্তিক’ আখ্যা দেন। লুথারকে ধর্মাধিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করার কথা ঘোষণা করে পোপ তাঁর কাছে এক আদেশনামাও পাঠান। কিন্তু লুথার পোপের সেই আদেশনামা জনসমক্ষে পুড়িয়ে দেন।

৬. ওয়ার্মসের সভায় মতপ্রকাশ : 

পোপের ইচ্ছানুসারে জার্মান সম্রাট পঞ্চম চার্লস জার্মানির ওয়ার্মস শহরে এক ধর্মীয় আলোচনাসভার আয়োজন করেন (১৫২১ খ্রি., ২১ এপ্রিল)। এই সভা ওয়ার্মসের সভা নামে পরিচিত। এই ধর্মসভায় সম্রাট, জার্মানবাসী ও পোপের প্রতিনিধির সামনে লুথার নিজের মতকে অভ্রান্ত বলে ঘোষণা করেন। এই ধর্মসভায় লুথারের আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে পোপ লুথারকে পুড়িয়ে মারার ও তাঁর রচিত সব পুস্তক পুড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু জার্মান সামন্ত রাজা ফ্রেডারিক লুথারকে আশ্রয় দিলে পোপের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।

মূল্যায়ন : 

বহু চেষ্টা সত্ত্বেও লুথারকে হত্যা করা বা তাঁর মতাদর্শকে মুছে দেওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ লুথারের মতবাদকে সাধারণ জার্মানবাসী থেকে শুরু করে আঞ্চলিক শাসকগণ পর্যন্ত সকলেই সমর্থন করেছিলেন। লুথার পোপের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করলে খ্রিস্টীয় জগৎ ক্যাথোলিক (পোপের সমর্থক) এবং প্রোটেস্ট্যান্ট (লুথারের সমর্থক) এই দু-ভাগে ভাগ হয়ে যায়।

Q3. রেনেসাঁ বলতে কী বুঝ? এর বৈশিষ্ট্য কী? 

ইংরেজি Renaissance শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ফরাসি শব্দ ‘Renaissant’ থেকে। যার অর্থ হচ্ছে নবজাগরণ বা পুনর্জাগরণ। ব্যাপক অর্থে মানুষের ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধি, চিন্তা ও বিবেকের বিকাশকে রেনেসাঁ বলা যায়। বাংলায় নবজাগতি বা আন্দোলন অর্থেও রেনেসাঁ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণ হলো একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন যার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। রেনেসাঁর মাধ্যমে সভ্যতার মধ্যযুগের পরিসমাপ্তি এবং আধুনিক যুগের সূচনা হয়। এটি মানুষের ব্যক্তিত্ব ও বিবেককে পুনর্জাগরিত করার সংগ্রাম হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষ মধ্যযুগের ধর্মীয় বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে নবযুগের বা আধুনিক যুগের সূচনা করে। রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে এ আধুনিক যুগকে স্বর্ণযুগ পারি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে মূলত রেনেসাঁ আন্দোলনের মাধ্যমেই আধুনিক যুগের আবির্ভাব ঘটে। এ আন্দোলনের মাধ্যমে আধুনিক যুগের দর্শন ও চিন্তাচেতনায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয় ।

রেনেসাঁর প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য :

রেনেসাঁ আন্দোলনের বেশ কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নিম্নে রেনেসাঁর প্রধান  বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

১. নবযুগের সূচনা রেনেসা একটি ব্যাপকভিত্তিক পরিবর্তনের নাম। মধ্যযুগে প্রাকৃতিক অপেক্ষা অতিপ্রাকৃতিক ধারণাসমূহ মানুষের চিন্তাকে অধিক প্রভাবিত করত। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশ লাভ করার ফলে অতিপ্রাকৃতিক ধারণাসমূহের পরিবর্তন হয় এবং মানুষের মধ্যে বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়।

২. সামাজিক চিন্তা-চেতনার ফসলআধুনিক যুগের সূচনায় সৃষ্ট আন্দোলন রেনেসাঁ, তৎকালীন সমগ্র সামাজিক চিন্তাচেতনার ফসল। রেনেসাঁর প্রভাবে সমাজের সকল ক্ষেত্রেই ধর্ম, জ্ঞানবিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, ব্যবসায়-বাণিজ্য ইত্যাদি নতুন চিন্তার উন্মেষ ঘটে । অতীতকে ভুলে গিয়ে মানুষ নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার সাথে নিয়োজিত হয়।

৩. শিল্প ও চিত্রকলার বিকাশ : রেনেসাঁর অন্যতম প্রধান একটি বৈশিষ্ট্য হলো শিল্প ও চিত্রকলার বিকাশ। এ সময়ের শিল্প ও চিত্রকলা মধ্যযুগের ধর্মাশ্রিত ও কাল্পনিক বিষয়ের আবর্ত থেকে বের হয়ে প্রেম, সৌন্দর্য, স্বাধীনতা প্রভৃতিকে মূল উপজীব্য হিসেবে গ্রহণ করে।

৪. ধর্ম ও নৈতিকতাবোধের গুরুত্ব হ্রাস : রেনেসাঁর অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ধর্ম ও নৈতিকতা যেমন অস্বীকার করেনি, বোধের গুরুত্ব হ্রাস, রেনেসা ধর্ম ও নৈতিকতাকে তেমনি এটিকেই একমাত্র জীবনসর্বস্ব করেও তোলেনি ধর্মীয় প্রভাব থেকে ব্যক্তিকে মুক্ত করতে রেনেসাঁ বা নবজাগরণ বিশেষভাবে সাহায্য করে।

৫. রাজনৈতিক অগ্রগতি সাধনরেনেসাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো মানবজাতির রাজনৈতিক অগ্রগতি সাধনে গণতান্ত্রিক চেতনাবোধের উন্মেষ ঘটানো। মধ্যযুগের স্বৈরতান্ত্রিকতা থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বিকাশ ঘটে মানুষ গির্জার অন্যায় প্রভাব থেকে পরিত্রাণ পেয়ে নিজেদের শাসন নিজেরা করার উপায় ও পদ্ধতি প্রবর্তন করে। সংক্ষেপে বলতে গেলে গণতান্ত্রিক চেতনাবোধ, ব্যক্তিস্বাধীনতা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জাতীয় রাষ্ট্রের আইনে রাজনৈতিক মৌলিক ধারণা প্রণয়নই হলো রেনেসাঁর ফলশ্রুতি।

৬. বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার পনেরো শতাব্দীর শেষের দিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নব নব আবিষ্কার ও উদ্ধাবন মানুষের কর্মময় জীবনে যে পরিবর্তন ও অগ্রগতি সাধন করে তা মানুষের জীবন ও জগতের সাথে তার সম্পর্কের দিগস্তকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। নানা দেশ ও জনপদের আবির উৎপাদন ক্ষেত্রে মাত্রাবৈপ্লবিক পরিবর্তন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে। সামগ্রিকভাবে এটি মানুষের জীবন, জীবনবোধ ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়।

৭. সংগ্রাম ও অভিযানের প্রেরণা দান : মধ্যযুগের কুসংস্কার, স্থবিরতা, দল-বদল, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের রাহুমুক্ত হওয়ার জন্য মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার ও স্বাধিকার প্রাপ্তিকল্পে সংগ্রাম ও অভিযান পরিচালনা করে। এতে যেমন যোগাযোগ ক্ষেত্রে সাধিত হয় অগ্রগতি, তেমনি প্রতিষ্ঠিত হয় সম্পর্কের নীতি ও ভিত।

৮. মূল্যবোধের পুনরাবির্ভাব : রেনেসাঁ মানুষের মূল্যবোধকে শানিত ও প্রসারিত করে। মানুষ তার জীবন ও জগৎকে খুবই নিকটবর্তী ভাবতে ও উপলব্ধি করতে শিখে। ধর্মের শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীনতা লাভ করে। মুক্ত মনের মুক্তচিন্তার দিগন্ত হয় প্রসারিত।

৯. ব্যাপকভিত্তিক পরিবর্তনের সূচনারেনেসাঁর একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ব্যাপকভিত্তিক পরিবর্তনের সূচনা। মধ্যযুগের ধর্মীয় সংকীর্ণতা থেকে রনেসাঁ মানবজীবনকে টেনে এনে এক মহাদিগন্তে বিচরণের অবকাশ সৃষ্টি করে। এতে মানুষের বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। মানুষের অতিপ্রাকৃতিক চিন্তাচেতনা, অবসান ঘটে।

১০. মানবতাবাদরেনেসাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মানবতাবাদ। এ আন্দোলনে মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, প্রাকৃতিক বিষয়ের প্রতি অনুরাগ, এমনকি স্বাধীনতা ও ঐক্যবদ্ধ মানব সভ্যতার কথাও প্রতিফলিত হয়েছিল। এ সময় মানবতাবাদের প্রবক্তাগণ ঈশ্বর চেতনার চেয়ে মানব চেতনায় বা মানবতাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহিত্যচর্চায় বা সাহিত্য রচনায় বেশি আগ্রহী হন।

১১. ভৌগোলিক আবিষ্কার রেনেসাঁর মাধ্যমে মানুষ ভৌগোলিক আবিষ্কারের অনুপ্রেরণা লাভ করে। এই সময় সামাজিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের মধ্যে অজানাকে জানার আগ্রহ জন্মেছিল। এই আগ্রহের কারণেই তখন মানুষ বিভিন্ন দ্বীপ আবিষ্কার করে। তাই ভৌগোলিক আবিষ্কার রেনেসাঁ যুগের বৈশিষ্ট্য বহন করে।

উপসংহার :

উপর্যুক্ত আলোচনার পরিশেষে বলা যায় যে, রেনেসাঁ সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে এর অতীতের ভালো বা মঙ্গলজনক ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে নয় বরং সেটাকে সামনে রেখে আরো সুন্দরের পথে গমন করা। তাই বলা যায়, রেনেসাঁর অবদান ব্যাপকভিত্তিক ও বহুমাত্রিক। মানুষের জীবন ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন সাধন করে কলি আধুনিক যুগের সূত্রপাত ঘটায়।

রেনেসাঁয় লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অবদান আলোচনা করো

রেনেসাঁসে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অবদান

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ছিলেন রেনেসাঁস যুগের অন্যতম বহুমুখী প্রতিভাধর ব্যক্তি। তিনি ছিলেন চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, স্থপতি, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, এবং গণিতবিদ। তার কাজ ও চিন্তাধারা রেনেসাঁসের মানবতাবাদী দর্শন এবং সৃজনশীলতাকে পূর্ণতা দিয়েছে। তাকে "বিশ্বমানব" (Universal Man) বা "রেনেসাঁস মানুষ" (Renaissance Man) বলা হয়। তার অবদান শিল্প, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, এবং মানবতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে রয়েছে।

১. চিত্রকলায় অবদান:

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির চিত্রকলার কাজ তাকে রেনেসাঁস শিল্পের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ক. মোনালিসা (Mona Lisa):

  • বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্ম, যা মানব মুখের অভিব্যক্তি, দৃষ্টি এবং আলোছায়ার নিখুঁত প্রয়োগের জন্য বিখ্যাত।
  • এটি রেনেসাঁসের বৈজ্ঞানিক ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক।

খ. দ্য লাস্ট সাপার (The Last Supper):

  • এটি খ্রিস্টান ধর্মের একটি বিখ্যাত চিত্রকর্ম, যা যীশু খ্রিস্ট এবং তার ১২ শিষ্যের শেষ নৈশভোজকে চিত্রিত করে।
  • আলোর ব্যবহারের মাধ্যমে চরিত্রগুলোর আবেগ এবং সম্পর্ককে নিখুঁতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।

গ. ভিট্রুভিয়ান ম্যান (Vitruvian Man):

  • এটি মানবদেহের সৌন্দর্য এবং গণিতের মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরে।
  • চিত্রটি রেনেসাঁস মানবতাবাদের ধারণার প্রতিফলন।

২. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদান:

লিওনার্দো ছিলেন একজন বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলী। তিনি প্রকৃতির পর্যবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ওপর ভিত্তি করে কাজ করেছেন।

ক. অ্যানাটমি:

  • তিনি মানবদেহের কাঠামো নিয়ে গভীর গবেষণা করেন এবং অসংখ্য সঠিক চিত্র অঙ্কন করেন।
  • তার অ্যানাটমিক্যাল ড্রয়িংস আজও চিকিৎসাশাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

খ. প্রকৌশল:

  • লিওনার্দো উড়োজাহাজ, ট্যাংক, সেতু এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির নকশা তৈরি করেন।
  • তার অনেক ধারণা আধুনিক প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছে।

গ. ভূগোল ও জলবিদ্যা:

  • তিনি নদী এবং পানির প্রবাহ নিয়ে গবেষণা করেছিলেন।
  • তার জলবিদ্যার কাজ পরিবেশ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অগ্রগামী।

৩. মানবতাবাদ ও দর্শনে অবদান:

রেনেসাঁস যুগে মানবতাবাদ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ধারণা। লিওনার্দোর কাজ এবং চিন্তাধারা এই দর্শনের মূর্ত প্রতীক।

  • তিনি মানব প্রকৃতি এবং সৃষ্টির সৌন্দর্য উদযাপন করেছেন।
  • তার কাজের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, বিজ্ঞান এবং শিল্প একে অপরের পরিপূরক।

৪. স্থাপত্য ও প্রকৌশলে অবদান:

  • লিওনার্দো বিভিন্ন স্থাপনার নকশা তৈরি করেছিলেন।
  • তিনি ভবন, দুর্গ এবং সেতুর কাঠামোগত নকশা এবং স্থায়িত্ব নিয়ে গবেষণা করেছিলেন।

৫. রেনেসাঁসের চেতনার প্রতীক:

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি তার জ্ঞানের বহুমুখিতা এবং সৃজনশীলতায় রেনেসাঁস যুগের মূল আদর্শগুলিকে ধারণ করেছেন।

  • তিনি কল্পনা, যুক্তি এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান তৈরি করেছিলেন।
  • তার কাজ রেনেসাঁস যুগের "মানবতাবাদ," "জ্ঞান-বিজ্ঞানের উদ্ভাবন," এবং "শিল্পের শ্রেষ্ঠত্ব" তুলে ধরেছে।

উপসংহার:

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ছিলেন রেনেসাঁস যুগের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব, যার কাজ এবং চিন্তাধারা আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, এবং চিত্রকলার ভিত্তি স্থাপন করেছে। তার বহুমুখী প্রতিভা এবং সৃজনশীলতা রেনেসাঁসের চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছে এবং আজও বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।


Q4. ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক দর্শন ব্যাখ্যা কর। ম্যাকিয়াভেলিকে কেন রেনেসাঁস ব্যক্তি বলা হয়। ব্যাখ্যা কর


নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (Niccolò Machiavelli) ছিলেন ইতালির রেনেসাঁ যুগের একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, লেখক এবং কূটনীতিক। তার রাজনৈতিক দর্শন আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং "প্রিন্স" (The Prince) গ্রন্থটি তার সবচেয়ে আলোচিত কাজ। তিনি বাস্তববাদী (realist) দৃষ্টিভঙ্গি ও ক্ষমতার রাজনীতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক চিন্তাধারার মূল বিষয়গুলো নিচে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. বাস্তববাদ ও নৈতিকতাহীনতা

ম্যাকিয়াভেলি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি নীতিশাস্ত্র (ethics) থেকে আলাদা একটি বিষয়। তার মতে, শাসকের জন্য নৈতিকতার চেয়ে কার্যকারিতা (efficiency) এবং ক্ষমতা রক্ষা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। "প্রিন্স"-এ তিনি লিখেছেন, শাসক যদি নৈতিক হতে গিয়ে ক্ষমতা হারান, তবে তা অগ্রহণযোগ্য।

তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, “উদ্দেশ্যই মাধ্যমকে বৈধ করে” (The end justifies the means)। অর্থাৎ শাসক যদি কোনো উচ্চতর লক্ষ্য অর্জনের জন্য কঠোর বা নিষ্ঠুর কাজ করেন, তবে সেটি গ্রহণযোগ্য।

২. ক্ষমতা ধারণা ও রাজনীতির স্বরূপ

ম্যাকিয়াভেলি মনে করতেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো ক্ষমতা। তার মতে,

  • রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে শাসকের ক্ষমতা ধরে রাখা অপরিহার্য।
  • শক্তি (force) এবং প্রতারণা (deception) একটি কার্যকর শাসকের অন্যতম দুটি প্রধান অস্ত্র।
  • জনগণকে ভয় দেখানো শাসকের প্রতি ভালোবাসা অর্জনের চেয়ে বেশি কার্যকর। যদিও শাসকের প্রতি জনগণের ভালোবাসা থাকলে ভালো হয়, তবে তিনি মনে করতেন, ভালোবাসার চেয়ে ভয় শ্রেষ্ঠ কারণ এটি দীর্ঘস্থায়ী।

৩. মানব প্রকৃতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি

ম্যাকিয়াভেলি মানব প্রকৃতিকে স্বার্থপর ও প্রতারক বলে মনে করতেন। তিনি বলেছিলেন,

  • মানুষ সহজেই আত্মস্বার্থে পরিচালিত হয়।
  • যখন সুযোগ আসে, মানুষ নিজের স্বার্থের জন্য অন্যকে প্রতারিত করতে দ্বিধা করে না।
    এ কারণে শাসককে অবশ্যই বাস্তববাদী এবং মানুষের প্রকৃতির দুর্বল দিকগুলোকে কাজে লাগানোর দক্ষ হতে হবে।

৪. সফল শাসকের গুণাবলী

ম্যাকিয়াভেলি এমন একজন শাসকের ধারণা দিয়েছিলেন যিনি একাধারে সিংহের মতো সাহসী এবং শিয়ালের মতো চতুর। তিনি বলেছিলেন,

  • শাসককে উচিত পরিস্থিতি অনুযায়ী নমনীয় হতে।
  • শাসকের কাছে নৈতিকতার চেয়ে তার ক্ষমতা ধরে রাখা এবং জনস্বার্থ রক্ষা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
  • একজন সফল শাসককে অবশ্যই বুদ্ধিমান, দূরদর্শী এবং কৌশলী হতে হবে।

৫. যুদ্ধ এবং রাষ্ট্রশক্তি

ম্যাকিয়াভেলি বিশ্বাস করতেন যে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রের মূল শক্তি। তার মতে:

  • যুদ্ধ এবং সামরিক প্রস্তুতি একটি শাসকের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
  • একটি দুর্বল সামরিক বাহিনী রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ।

৬. ধর্ম ও রাজনীতি

ম্যাকিয়াভেলি ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখতেন। তার মতে:

  • ধর্ম জনগণকে একত্রিত করার এবং শাসকের কর্তৃত্বকে বৈধতা দেওয়ার একটি মাধ্যম।
  • শাসককে ধর্মীয় মূল্যবোধ ব্যবহার করে জনগণের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে, যদিও শাসক নিজে ধর্মবিশ্বাসে দৃঢ় না-ও হতে পারেন।

৭. গণতন্ত্র ও একনায়কত্বের মধ্যে ভারসাম্য

ম্যাকিয়াভেলি প্রজাতন্ত্র এবং রাজতন্ত্র উভয়ের পক্ষে কথা বলেছেন। তবে তিনি মনে করতেন,

  • অস্থির সময়ে একটি শক্তিশালী একনায়কত্ব প্রয়োজনীয় হতে পারে।
  • স্থিতিশীল সময়ে প্রজাতন্ত্র শ্রেয়, কারণ এটি জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।
সমালোচনা

ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক দর্শন ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। তার চিন্তাধারাকে অনেকে "নীতিহীন রাজনীতি" বা "ক্ষমতার জন্য ক্ষমতা" হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে বাস্তববাদী ও কার্যকর রাষ্ট্রচিন্তার জন্য তাকে আজও স্মরণ করা হয়।

উপসংহার:
ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক দর্শন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি ভিত্তি। তিনি কল্পনার চেয়ে বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন এবং শাসকদের জন্য কার্যকর উপদেশ প্রদান করেছিলেন। তার চিন্তাধারা সময়ের সীমা ছাড়িয়ে আজও প্রাসঙ্গিক, বিশেষত রাজনীতি, কূটনীতি এবং ক্ষমতার ক্ষেত্রে।

ম্যাকিয়াভেলিকে কেন রেনেসাঁস ব্যক্তি বলা হয়

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলিকে "রেনেসাঁস ব্যক্তি" বলা হয় তার বহুমুখী প্রতিভা, চিন্তাভাবনার স্বকীয়তা এবং রেনেসাঁস যুগের মূল্যবোধগুলোর প্রতিফলনের জন্য। রেনেসাঁস (Renaissance) ছিল একটি সাংস্কৃতিক, বৌদ্ধিক এবং শিল্পের নবজাগরণের যুগ, যেখানে মানবতাবাদ, বাস্তববাদ এবং কল্পনাশক্তির নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছিল। ম্যাকিয়াভেলির কাজ ও চিন্তাধারা এই যুগের মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নিচে এই বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলো:

১. মানবতাবাদ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ওপর গুরুত্ব

রেনেসাঁসের সময় মানুষ ও তার সম্ভাবনাকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছিল। ম্যাকিয়াভেলি তার লেখায় রাজনীতি ও ক্ষমতার ক্ষেত্রে মানব প্রকৃতি, চাহিদা এবং দুর্বলতাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

  • তার চিন্তাভাবনা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে গুরুত্ব দেয় এবং শাসককে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে রাজ্য পরিচালনার পরামর্শ দেয়।
  • "প্রিন্স" গ্রন্থে তিনি শাসকের কার্যকারিতা ও ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য মানুষের প্রকৃতিকে কাজে লাগানোর উপর জোর দিয়েছেন, যা রেনেসাঁস মানবতাবাদের একটি নিদর্শন।

২. বাস্তববাদের ওপর জোর

রেনেসাঁসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বাস্তববাদ (Realism)। মধ্যযুগীয় ধ্রুপদী চিন্তাধারা থেকে সরে এসে রেনেসাঁসে বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হয়। ম্যাকিয়াভেলি এই ধারার অগ্রদূত ছিলেন।

  • তিনি নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতা, কার্যকারিতা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
  • তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মধ্যযুগের আধ্যাত্মিক রাজনীতি থেকে পৃথক, যা রেনেসাঁস যুগের ধর্মনিরপেক্ষ (secular) মনোভাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

৩. ইতিহাস ও মানব প্রকৃতির গভীর বিশ্লেষণ

রেনেসাঁসের সময় ইতিহাসের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। ম্যাকিয়াভেলি ইতিহাসের অধ্যয়নকে রাজনৈতিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখতেন।

  • তার লেখায় তিনি রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসসহ প্রাচীন কালের বিভিন্ন উদাহরণ ব্যবহার করেছেন।
  • তিনি বিশ্বাস করতেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বর্তমান সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

৪. ধর্ম ও রাজনীতির পৃথকীকরণ

মধ্যযুগে ধর্ম ছিল রাজনীতির মূল নিয়ন্ত্রক শক্তি। কিন্তু রেনেসাঁসে ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারা জোরালো হয়ে ওঠে।

  • ম্যাকিয়াভেলি তার রাজনৈতিক দর্শনে রাজনীতিকে ধর্ম থেকে পৃথক করার পক্ষে ছিলেন।
  • তিনি ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কথা বললেও, রাজনীতিকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন একটি ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

৫. বহুমুখী প্রতিভা

রেনেসাঁস ব্যক্তি সাধারণত বহুমুখী প্রতিভাধর হন, এবং ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন তেমনই একজন।

  • তিনি শুধু রাজনৈতিক চিন্তাবিদই ছিলেন না, বরং একজন কূটনীতিক, নাট্যকার এবং কবিও ছিলেন।
  • তার নাটক "La Mandragola" (দ্য ম্যান্ডরেক) রেনেসাঁস যুগের ইতালিয়ান সাহিত্য ও নাট্যধারার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

৬. নবজাগরণের সাহসী ও উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি

রেনেসাঁস যুগের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাইরে গিয়ে নতুন চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠা করা।

  • ম্যাকিয়াভেলি শাসকের জন্য প্রচলিত নৈতিকতার বাইরে গিয়ে বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর পন্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
  • তার দৃষ্টিভঙ্গি সাহসী এবং সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রসর ছিল।

৭. ইতালির রেনেসাঁস রাজনীতির অংশীদারিত্ব

ম্যাকিয়াভেলি তার জীবনের বেশিরভাগ সময় ইতালির ফ্লোরেন্সে কাটিয়েছেন, যা ছিল রেনেসাঁসের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

  • তিনি ফ্লোরেন্টাইন প্রজাতন্ত্রের সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
  • তার কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তাকে রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে এবং তার দর্শন গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

উপসংহার

ম্যাকিয়াভেলিকে রেনেসাঁস ব্যক্তি বলা হয় কারণ তিনি রেনেসাঁস যুগের মানবতাবাদ, বাস্তববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং নবচিন্তার প্রতীক। তার বহুমুখী প্রতিভা, ইতিহাস ও রাজনীতির প্রতি গভীর দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তাধারার উদ্ভাবনীতা তাকে রেনেসাঁস যুগের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত করে।

Q5. হব্বস এর সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট ( কর্তৃত্ব বাদী সরকার বেবস্থা )

থমাস হব্বসের সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট (কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা)

থমাস হব্বস (Thomas Hobbes) ছিলেন ১৭শ শতকের ইংরেজী দার্শনিক, যিনি বিশেষত "সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট" তত্ত্বের জন্য বিখ্যাত। তাঁর দার্শনিক কাজ "লেভিয়ানথান" (Leviathan) (১৬৫১) একটি মৌলিক রচনা, যা রাজনৈতিক তত্ত্ব এবং সমাজতত্ত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। হব্বসের মতে, মানুষের প্রাথমিক অবস্থায় সমাজ ছিল একটি "অরাজক" (anarchic) পরিস্থিতি, যেখানে শক্তি ও আইন ছাড়া মানুষ একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করত। সামাজিক শান্তি এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে, মানুষকে একটি শক্তিশালী শাসক বা রাষ্ট্রের অধীনে সমঝোতা করতে হয়, যা তাকে "সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট" তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন।

থমাস হব্বসের সোশ্যাল কন্ট্রাক্টের মূল ধারণা

১. প্রাক-সামাজিক অবস্থা (State of Nature)

হব্বসের মতে, মানুষের প্রাকৃতিক অবস্থায় কোনো সরকার বা শাসক নেই এবং ব্যক্তি নিজের জন্যই আইন তৈরি করে। এই অবস্থাকে তিনি "স্টেট অফ নেচার" বা প্রাকৃতিক অবস্থার নাম দিয়েছেন।

  • এই অবস্থায় প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজস্ব স্বার্থকে রক্ষা করতে চায়, যার ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি হয়।
  • হব্বস প্রাকৃতিক অবস্থাকে "প্রাকৃতিক যুদ্ধ" (war of all against all) হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে মানুষ একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে।

২. সামাজিক চুক্তি (Social Contract)

হব্বসের মতে, মানুষের এই অরাজক পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তারা একটি সামাজিক চুক্তি বা "সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট" তৈরি করে।

  • মানুষ তাদের কিছু স্বাধীনতা রাষ্ট্রকে প্রদান করে, যাতে তারা নিরাপত্তা ও শান্তি পেতে পারে।
  • সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে, মানুষ একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অধীনে একত্রিত হয়, যা আইন প্রণয়ন, বিচার এবং শাসন কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

৩. শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার (Leviathan)

হব্বসের মতে, এই সামাজিক চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো একটি শক্তিশালী সরকার প্রতিষ্ঠা করা, যাকে তিনি "লেভিয়ানথান" (Leviathan) বলে আখ্যায়িত করেন।

  • লেভিয়ানথান হলো একটি অপরাজেয় শক্তিশালী শাসক বা সরকার, যাকে জনগণ অবিচলভাবে কর্তৃত্ব দিতে রাজি থাকে।
  • এই শাসক বা সরকারকে "অ্যাবসোলিউট" (absolutely) ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে তিনি সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারেন এবং মানুষের জীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন।
  • হব্বসের মতে, এই শক্তিশালী সরকার ছাড়া মানুষের মধ্যে বিশৃঙ্খলা এবং অরাজকতা ছড়িয়ে পড়বে।

৪. জনগণের অধিকার এবং কর্তৃত্বের সীমা

  • হব্বসের তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজ চুক্তির মাধ্যমে জনগণ কিছু অধিকার সরকারকে হস্তান্তর করে, কিন্তু তারা এই শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে না।
  • কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে, রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব সকল সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করবে এবং জনগণ সরকারের আদেশ পালন করবে।
  • জনগণকে তাদের স্বাধীনতা এবং অধিকার পরিত্যাগ করতে হয়, কিন্তু বিনিময়ে তারা নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা লাভ করে।

৫. সরকারের বৈধতা ও জনগণের দায়িত্ব

  • হব্বসের মতে, একবার শাসক বা সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে, তার আদেশ মেনে চলা জনগণের কর্তব্য।
  • সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য শাসককে একনায়ক বা কর্তৃত্ববাদী হতে হবে।
  • জনগণ শাসককে বিতর্ক বা বিরোধিতা করতে পারে না, কারণ সরকারের মূল উদ্দেশ্যই হলো নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা।
  • সরকারের মধ্যে যে কোনো অস্থিতিশীলতা বা দুর্বলতা সমাজকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

হব্বসের শাসন ব্যবস্থা: কর্তৃত্ববাদী সরকার

হব্বসের সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট তত্ত্ব কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার পক্ষে, যা মূলত জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকারকে শাসকের কাছে হস্তান্তরের ওপর ভিত্তি করে।

  • কর্তৃত্ববাদী সরকার: হব্বসের মতে, একটি শক্তিশালী একনায়কী সরকার ছাড়া সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
  • অ্যাবসোলিউট ক্ষমতা: রাষ্ট্র বা শাসককে অপরিসীম বা "অ্যাবসোলিউট" ক্ষমতা দেওয়ার মাধ্যমে, জনগণ তাদের জীবনে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা আশা করে।
  • অরাজকতার বিরুদ্ধে সুরক্ষা: হব্বস এই তত্ত্বের মাধ্যমে অরাজকতা এবং বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য একটি শক্তিশালী শাসকের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন।

উপসংহার

থমাস হব্বসের সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট তত্ত্ব মানবজাতির জন্য একটি শক্তিশালী এবং কর্তৃত্ববাদী সরকারের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে, যা শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং সামাজিক শান্তি নিশ্চিত করতে সক্ষম। যদিও তার এই তত্ত্ব আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিপরীত, তবুও এটি রাষ্ট্রের অধিকার এবং শাসক ক্ষমতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।


Q6. Locke two treaties of govt

জন লকের "টু ট্রিটিস অফ গভর্নমেন্ট" (Two Treatises of Government) - বিস্তারিত আলোচনা

জন লক (John Locke) ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক, যিনি আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর "টু ট্রিটিস অফ গভর্নমেন্ট" (Two Treatises of Government) (১৬৮৯) কাজটি রাজনৈতিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গ্রন্থে লক সরকারের প্রাকৃতিক অবস্থার ব্যাখ্যা করেছেন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বৈধতা ও সীমা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এটি বিশেষভাবে আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। লকের চিন্তাভাবনা, বিশেষত সমাজ চুক্তি এবং সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে, তার সময়ে রাজতন্ত্র এবং একনায়ক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

টু ট্রিটিস অফ গভর্নমেন্টের মূল বিষয়বস্তু

প্রথম ট্রিটিস: রাজতন্ত্রের পক্ষে যুক্তির বিপক্ষে বিতর্ক

প্রথম ট্রিটিসে জন লক রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদান করেন এবং একনায়ক শাসনের সমালোচনা করেন। তিনি প্রধানত রবার্ট ফিলমার (Robert Filmer) এর "প্যাট্রিয়আর্কা" (Patriarcha) নামক বইটি খণ্ডন করেছেন, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য "ঐশ্বরিক অধিকার" তত্ত্বের পক্ষে ছিল।

  • ফিলমার দাবি করেছিলেন যে, রাজা বা শাসকের ক্ষমতা ঐশ্বরিক অধিকার থেকে আসে এবং তার শাসন জনগণের ওপর কঠোরভাবে আরোপিত হতে পারে।
  • লক এই তত্ত্বের বিপরীতে যুক্তি দেন যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ঐশ্বরিক নয়, বরং মানুষের সম্মতি এবং চুক্তির ভিত্তিতে হতে হবে।

দ্বিতীয় ট্রিটিস: সরকারের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য এবং ক্ষমতা

দ্বিতীয় ট্রিটিসে লক "প্রাকৃতিক অবস্থা" (State of Nature), "সমাজ চুক্তি" (Social Contract), এবং "গণতান্ত্রিক সরকারের" (Democratic Government) ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই গ্রন্থের মাধ্যমে লক তার রাজনৈতিক তত্ত্বের মূল কাঠামো উপস্থাপন করেছেন।

  1. প্রাকৃতিক অবস্থা (State of Nature)
    লকের মতে, প্রাকৃতিক অবস্থায় মানুষ স্বাধীন, সমান এবং স্বাধীনভাবে নিজেদের অধিকার রক্ষা করতে পারে। তবে, এই অবস্থা একটি "অরাজক" (anarchic) অবস্থাও হতে পারে, যেখানে আইন এবং সরকার না থাকার কারণে মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

  2. প্রাকৃতিক অধিকার (Natural Rights)
    লক মানুষকে তিনটি প্রাকৃতিক অধিকার দিয়েছেন:

    • জীবন (Life)
    • স্বাধীনতা (Liberty)
    • সম্পত্তি (Property)
      এই অধিকারগুলো মানবাধিকার এবং তাদের রক্ষা করতে কোনো সরকার বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
  3. সমাজ চুক্তি (Social Contract)
    লক সমাজ চুক্তির মাধ্যমে মানুষের সম্মতির ভিত্তিতে একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করার পক্ষে ছিলেন। এই চুক্তি দ্বারা জনগণ তাদের কিছু স্বাধীনতা ছেড়ে সরকারকে ক্ষমতা প্রদান করে, তবে রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হবে জনগণের প্রাকৃতিক অধিকার রক্ষা করা।

    • জনগণের সম্মতির ভিত্তিতেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে এবং শাসকের ক্ষমতা অবশ্যই জনগণের মঙ্গল সাধনে সীমাবদ্ধ থাকবে।
  4. সরকারের বৈধতা ও সীমাবদ্ধতা (Legitimacy and Limits of Government)
    লকের মতে, সরকারের বৈধতা জনগণের সম্মতির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। তবে, সরকারের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকতে হবে এবং জনগণের অধিকারকে সুরক্ষিত করতে হবে। যদি সরকার তার দায়িত্ব ভুলভাবে পালন করে বা জনগণের অধিকার লঙ্ঘন করে, তবে জনগণের অধিকার রয়েছে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার।

    • এই ধারণাটি পরবর্তীতে বিপ্লবের অধিকার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  5. অধিকার রক্ষা ও জনগণের কর্তৃত্ব (Protection of Rights and Popular Sovereignty)
    লক তার তত্ত্বে জনগণের সার্বভৌমত্ব বা সর্বোচ্চ ক্ষমতার কথা বলেন। এর মানে হল যে, সরকার জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবে, এবং জনগণ তাদের অধিকার রক্ষা করতে সক্ষম হবে। সরকারের কর্তৃত্ব জনগণের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এবং জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী সরকারকে পরিবর্তন করা যাবে।

লকের রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রধান উপাদান

  • প্রাকৃতিক অধিকার: লক বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের জন্মগত অধিকার হলো জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তি।
  • সমাজ চুক্তি: মানুষ একে অপরের মধ্যে সহযোগিতা এবং শান্তির জন্য একটি সরকারের কাছে সম্মতি দেয়, যা তাদের অধিকার রক্ষা করবে।
  • গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান: লক একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন, যেখানে জনগণই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী।
  • সরকারের সীমাবদ্ধতা: রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব জনগণের সম্মতির উপর নির্ভরশীল এবং তা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
  • সরকার বদলানোর অধিকার: যদি সরকার জনগণের অধিকার রক্ষা না করে বা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পূরণ না করে, তবে জনগণ তা বদলানোর অধিকার রাখে।

উপসংহার

"টু ট্রিটিস অফ গভর্নমেন্ট" জন লকের রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছে। তার সমাজ চুক্তি তত্ত্ব, প্রাকৃতিক অধিকার এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণা আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় এক বিপ্লব সৃষ্টি করে। লক-এর এই তত্ত্বগুলো পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, এবং আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।


Q7. রুশোর সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট (Rousseau's Social Contract)


রুশোর সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট (Rousseau's Social Contract)

জিন-জ্যাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau) ছিলেন ১৭শ থেকে ১৮শ শতকের এক বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক, যিনি তাঁর বই "দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট" (The Social Contract) (১৭৬২) তে রাষ্ট্র, সমাজ এবং মানুষের সম্পর্ক নিয়ে গভীর দার্শনিক চিন্তা করেন। রুশো তাঁর তত্ত্বে মানুষের স্বাধীনতা, সমতা, এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বের বিষয় তুলে ধরেছেন, যা আধুনিক গণতন্ত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

রুশো সামাজিক চুক্তির ধারণাকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে সমাজের মধ্যে এক ধরনের পারস্পরিক সম্মতি প্রতিষ্ঠিত হবে, যার মাধ্যমে ব্যক্তি তার স্বাধীনতা এবং অধিকার রাষ্ট্রের কাছে তুলে দিতে রাজি হয়, কিন্তু একই সঙ্গে সমাজের সাধারণ ভালোর জন্যও তা করা হবে। এটি মূলত জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি তাঁর গভীর বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে।

রুশোর সোশ্যাল কন্ট্রাক্টের মূল ধারণা

১. প্রাকৃতিক অবস্থা (State of Nature)

রুশো তাঁর সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট তত্ত্বের শুরুতে "প্রাকৃতিক অবস্থার" ধারণা তুলে ধরেছেন, যা তিনি মানুষের প্রথম অবস্থা হিসেবে দেখেন।

  • রুশো অনুযায়ী, মানুষের প্রাকৃতিক অবস্থা ছিল স্বাধীন এবং সমতাভিত্তিক, যেখানে সবাই একে অপরের সহায়তায় জীবনযাপন করত।
  • তবে সমাজের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে ব্যক্তি স্বার্থ, প্রতিযোগিতা, এবং বৈষম্য সৃষ্টি হতে থাকে, যার ফলস্বরূপ অরাজকতা এবং অসন্তুষ্টি তৈরি হয়।

২. সামাজিক চুক্তি (Social Contract)

রুশো বলেন যে, মানব সমাজে শৃঙ্খলা, সমতা এবং স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সামাজিক চুক্তি প্রয়োজন। এই চুক্তির মাধ্যমে মানুষ স্বেচ্ছায় তাদের কিছু স্বাধীনতা রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করবে।

  • রুশো বলেন, সামাজিক চুক্তি "পপুলার সোভেরেনিটি" (Popular Sovereignty) বা জনগণের সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে হবে, অর্থাৎ সরকার জনগণের ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করবে।
  • সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সম্মান করবে এবং একে অপরের প্রতি সম্মান ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করবে।

৩. সাধারণ ইচ্ছা (General Will)

রুশোর সোশ্যাল কন্ট্রাক্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো "সাধারণ ইচ্ছা" (General Will)। সাধারণ ইচ্ছা হলো জনগণের ঐক্যবদ্ধ ইচ্ছা, যা সব মানুষের কল্যাণে কাজ করে এবং যেটি একক ব্যক্তির স্বার্থের চেয়ে বৃহত্তর হয়।

  • সাধারণ ইচ্ছা জনগণের সম্মতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং এটি একক ব্যক্তির ইচ্ছার তুলনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।
  • রুশো মনে করতেন যে, যদি সমাজের সদস্যরা একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেন এবং সাধারণ ভালোর জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তবে তা রাষ্ট্রের কল্যাণে সমর্থ হবে।
  • সাধারণ ইচ্ছা সর্বদা সঠিক এবং মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করবে।

৪. জনগণের সার্বভৌমত্ব (Popular Sovereignty)

রুশো সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক জনগণকে মনে করতেন। সরকারের অধিকার এবং ক্ষমতা শুধুমাত্র জনগণের সম্মতির ওপর নির্ভরশীল।

  • জনগণ তাদের সম্মতি দিয়ে সরকার প্রতিষ্ঠা করবে এবং যখনই জনগণের ইচ্ছা পরিবর্তন হবে, তখন সরকারের পরিবর্তন হবে।
  • সরকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, এবং তার দায়িত্ব হলো জনগণের মঙ্গল সাধন করা।

৫. স্বাধীনতা ও সমতা

রুশো তার তত্ত্বে বিশেষভাবে স্বাধীনতা ও সমতার ধারণাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

  • তিনি বলেন, মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা হলো "স্বাভাবিক স্বাধীনতা" (natural freedom) থেকে বেরিয়ে গিয়ে সামাজিক শৃঙ্খলা ও নিয়মের মধ্যে থেকেও স্বাধীনতা পাওয়া।
  • সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে সকল নাগরিকের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকবে না এবং সবাই সমান সুযোগ ও অধিকার ভোগ করবে।
  • জনগণের মধ্যে ঐক্য, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠিত হলে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন সম্ভব।

৬. সরকার ও তার রূপ

রুশো বিভিন্ন ধরনের শাসন ব্যবস্থা (রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র) নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

  • তাঁর মতে, একটি গণতান্ত্রিক সরকার হলো একটি সরকার যা জনগণের ইচ্ছা এবং সাধারণ ইচ্ছার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
  • তিনি বিশ্বাস করতেন যে, একটি ভালো সরকার জনগণের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হবে।
  • সরকার এবং জনগণের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক থাকবে, যেখানে সরকারের কর্তৃত্ব জনগণের মঙ্গল সাধন করবে।

রুশোর সোশ্যাল কন্ট্রাক্টের মূল বৈশিষ্ট্য

  1. সাধারণ ইচ্ছার ভিত্তিতে শাসন: সরকার জনগণের সাধারণ ইচ্ছা ও সম্মতির ভিত্তিতে কাজ করবে, যা জনগণের কল্যাণের জন্য হবে।
  2. গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা: রুশো বিশ্বাস করতেন যে, সকল নাগরিকের সমান অধিকার থাকা উচিত এবং তাদের ইচ্ছা অনুসারে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।
  3. স্বাধীনতা ও সমতা: জনগণকে সমান অধিকার এবং স্বাধীনতা দেয়া হবে, এবং সমাজে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না।
  4. সরকারের সীমাবদ্ধতা: সরকার শুধুমাত্র জনগণের কল্যাণে কাজ করবে এবং তার ক্ষমতার সীমা থাকবে।

উপসংহার

রুশোর "সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট" তত্ত্ব আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি জনগণের সার্বভৌমত্ব, সাধারণ ইচ্ছা, এবং সামাজিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে একটি ন্যায়বিচারপূর্ণ, স্বাধীন ও সমতাবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি শক্তিশালী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন। রুশোর তত্ত্বের মাধ্যমে আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা এবং গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার ধারণা আরও সুস্পষ্ট হয়েছে, যা আজও রাজনৈতিক তত্ত্ব এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ।

Q8. জে.এস. মিলের "লিবারটি" তত্ত্ব

জে.এস. মিলের "লিবারটি" তত্ত্ব (J.S. Mill's Concept of Liberty)

জে.এস. মিল (John Stuart Mill) ছিলেন ১৯শ শতকের একজন প্রভাবশালী ইংরেজ দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী এবং অর্থনীতিবিদ, যিনি বিশেষত তার কাজ "অন লিবারটি" (On Liberty) (১৮৫৯) এর জন্য খ্যাত। মিলের লিবারটি তত্ত্ব স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত অধিকার এবং সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে গভীর চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ করেছে। তার তত্ত্বটি আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের অধিকার এবং স্বাধীনতার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করেছে।

মিলের লিবারটি তত্ত্ব মূলত ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং সমাজের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি কাঠামো প্রস্তাব করে, যেখানে সরকারের হস্তক্ষেপ কেবলমাত্র তখনই বৈধ হবে যখন তা সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে সাহায্য করবে।

জে.এস. মিলের "লিবারটি" তত্ত্বের মূল ধারণা

১. ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সরকারের সীমাবদ্ধতা

মিলের মতে, প্রতিটি ব্যক্তির মৌলিক অধিকার হলো তার নিজের জীবন এবং সম্পত্তি নিয়ে স্বাধীনভাবে বাস করা। সমাজ বা সরকার ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারে না, যতক্ষণ না সে অন্যদের স্বাধীনতা বা কল্যাণ ক্ষুণ্ণ করছে।

  • মিলের মতে, "স্বাধীনতা" হচ্ছে এমন একটি অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি তার নিজস্ব মতামত, বিশ্বাস, এবং কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে, যতক্ষণ না তা অন্যদের ক্ষতি বা নির্যাতন সৃষ্টি করছে।
  • তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সরকার বা সমাজের কর্তব্য হলো জনগণের অধিকার এবং স্বাধীনতা রক্ষা করা, কিন্তু ব্যক্তির স্বাধীনতার প্রতি অযথা হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।

২. স্বাধীনতার চারটি ক্ষেত্র

মিল তার "অন লিবারটি" রচনায় স্বাধীনতার চারটি প্রধান ক্ষেত্র উল্লেখ করেছেন:

  • মত প্রকাশের স্বাধীনতা: মানুষের মতামত প্রকাশের অধিকার থাকা উচিত, এমনকি যদি সেই মতামত সমাজের বা সরকারের সঙ্গে বিরোধীও হয়। মিল বিশ্বাস করতেন যে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের উন্নতির জন্য অপরিহার্য।
  • প্রকাশ ও প্রকাশের স্বাধীনতা: সরকার বা সমাজকে কোনো মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া উচিত নয়, কারণ এটি মানুষের চিন্তাশক্তির বিকাশে সহায়ক।
  • স্বাধীন কর্মকাণ্ডের অধিকার: মানুষের স্বাধীনভাবে জীবনযাপন, পেশা নির্বাচন এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার অধিকার থাকা উচিত, যতক্ষণ না তা অন্যদের ক্ষতি করছে।
  • সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা: ব্যক্তির ইচ্ছা অনুযায়ী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো এবং সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করার স্বাধীনতা থাকা উচিত।

৩. ক্ষতির নীতি (Harm Principle)

মিলের "লিবারটি" তত্ত্বের অন্যতম মূল ধারণা হলো "ক্ষতির নীতি" (Harm Principle)। এই নীতির মাধ্যমে তিনি ব্যক্তির স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করেছেন।

  • মিল বলেন, "একটি ব্যক্তি যতদিন তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষতি না করে, ততদিন তার স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করা যাবে না"
  • অর্থাৎ, যদি কোনো ব্যক্তি তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অন্যদের ক্ষতি না করে, তবে সমাজ বা সরকার তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
  • তবে, যদি কোনো ব্যক্তি তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অন্যকে ক্ষতি করে, তখন সমাজ বা রাষ্ট্রের কর্তব্য হলো সেই ব্যক্তির স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করা, যাতে সমাজের অন্য সদস্যদের স্বার্থ রক্ষা করা যায়।

৪. জনগণের সুবিধা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

মিল তার তত্ত্বে গণতান্ত্রিক শাসনের উপকারিতা স্বীকার করলেও, তিনি সতর্ক করেছিলেন যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনও কখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের স্বার্থে সংখ্যালঘুদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।

  • মিলের মতে, "সংখ্যাগরিষ্ঠতার দমনমূলক শক্তি" জনগণের মতামতের বিরুদ্ধে চলতে পারে, যার ফলে সংখ্যালঘুদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
  • তিনি ব্যক্তির স্বাধীনতার সুরক্ষা দেওয়ার জন্য গণতন্ত্রের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধতা প্রস্তাব করেছিলেন, যাতে জনগণের পক্ষ থেকে অন্যের অধিকার লঙ্ঘন না হয়।

৫. সমাজ ও ব্যক্তির সম্পর্ক

মিল বিশ্বাস করতেন যে, সমাজের উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তির স্বাধীনতা ও কল্যাণ রক্ষা করা, তবে এটি ব্যক্তির স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

  • সমাজের স্বার্থ ব্যক্তির স্বাধীনতার মধ্যে বাধা সৃষ্টি না করে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।
  • তিনি বলেছিলেন, "যখন সমাজ বা সরকার মানুষের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, তখন সে সেই ব্যক্তির স্বাভাবিক উন্নতির জন্য হুমকি তৈরি করে"

৬. শিক্ষার গুরুত্ব

মিল মনে করতেন যে, মানুষকে তার স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহার শেখানোর জন্য শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করে এবং তাকে সমাজে ভালোভাবে বাস করতে সহায়তা করে।
  • ব্যক্তির স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও আত্মনির্ভরতা সৃষ্টি করতে হবে।

উপসংহার

জে.এস. মিলের "লিবারটি" তত্ত্ব আধুনিক সমাজে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা প্রদান করেছে। তার তত্ত্বের মূল বার্তা হলো: ব্যক্তি তার স্বাধীনতার পূর্ণ অধিকারী, যতক্ষণ না সে অন্যদের ক্ষতি করছে। মিলের "ক্ষতির নীতি" এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার ধারণা গণতান্ত্রিক সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার এই চিন্তা আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি অবিচলিত ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।


Q9. কার্ল মার্কসের "কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো" বইয়ের আলোচনা

"কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো" (The Communist Manifesto) ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কস (Karl Marx) এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels) যৌথভাবে রচনা করেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল, যা বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণী ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দেয় এবং সমাজে শ্রেণী সংগ্রামের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে। "কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো" একদিকে যেমন সমাজতন্ত্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, অন্যদিকে এটিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পুনর্গঠন ও শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার মূল দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা হয়েছে।

এই বইটি ১৯শ শতকের মধ্যভাগে ইউরোপীয় সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল ছিল এবং আধুনিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনগুলির ভিত্তি স্থাপন করে। মার্কসের তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজের শ্রেণী বিভাজন ও অর্থনৈতিক শোষণকে কেন্দ্র করে বিপ্লব সংগঠিত হবে, যার ফলে শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে।

কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর মূল ধারণা

১. সমাজের শ্রেণী বিভাজন এবং শ্রেণী সংগ্রাম

মার্কস তাঁর মেনিফেস্টোতে সমাজের শ্রেণী বিভাজনের ভিত্তি হিসেবে অর্থনৈতিক শ্রেণী সংগ্রামের ধারণা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ইতিহাসে সব সমাজে দুটি প্রধান শ্রেণী ছিল:

  • পুঁজিপতি (Bourgeoisie): যাদের মূলধন এবং উৎপাদন যন্ত্র রয়েছে। এই শ্রেণী প্রাকৃতিক সম্পদ এবং শ্রমিকদের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করে।
  • শ্রমিক শ্রেণী (Proletariat): যাদের কোনো পুঁজি নেই, তারা কেবল তাদের শ্রম বিক্রি করে জীবন ধারণ করে।

মার্কস বলেন যে, এই দুটি শ্রেণীর মধ্যে একটি তীব্র সংঘর্ষ বিদ্যমান, এবং পুঁজিপতি শ্রেণী শ্রমিক শ্রেণীকে শোষণ করে তাদের শ্রমের মূল্য লুণ্ঠন করে।

২. ইতিহাসের শ্রেণী সংগ্রাম

মার্কসের মতে, ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে শ্রেণী সংগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করেছে।

  • তিনি বলেন, সমাজের ভিতরে অবিচ্ছিন্নভাবে শ্রেণী সংঘর্ষ চলছে, এবং এই সংঘর্ষের মাধ্যমেই সমাজের পরিবর্তন হয়।
  • "কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো" বলেছে, "ইতিহাসের সমস্ত সমাজই শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস।"
  • মার্কস মনে করতেন, পুঁজিবাদী সমাজে এই শ্রেণী সংগ্রাম চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করবে, যার ফলে শ্রমিক শ্রেণী বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করবে এবং শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে।

৩. পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শোষণ

মার্কস তার তত্ত্বে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিভিন্ন অঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিকদের কাজের মূল্য তাদের দ্বারা উৎপাদিত মূল্য থেকে অনেক কম, কারণ পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের শোষণ করে।

  • পুঁজিপতি শ্রেণী উৎপাদন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং তারা শ্রমিকদের কাজের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করে, যা শ্রমিকদের ন্যায্য মূল্য নয়।
  • এভাবে শ্রমিকদের শোষণ ও মুনাফা অর্জন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

৪. বিপ্লব এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা

মার্কস এবং এঙ্গেলস কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে বলেছেন যে, শ্রমিক শ্রেণীকে একত্রিত হয়ে বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদী শোষণকে উচ্ছেদ করতে হবে।

  • মার্কসের মতে, শ্রমিক শ্রেণী একত্রিত হলে তারা রাষ্ট্রের বিরোধিতা করতে সক্ষম হবে।
  • প্রথমে শ্রমিকরা রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করবে, কিন্তু পরবর্তীতে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে এবং এটি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে, যার ফলে একটি শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে।
  • এই শ্রেণীহীন সমাজে ব্যক্তিগত মালিকানা এবং শ্রেণী বিভাজন থাকবে না, এবং সমাজ সমতার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।

৫. কমিউনিস্টদের উদ্দেশ্য

মেনিফেস্টোতে কমিউনিস্ট দলের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কমিউনিস্টদের লক্ষ্য ছিল:

  • শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা।
  • পুঁজিবাদী শোষণ ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা।
  • রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে শ্রমিক শ্রেণীর হাতে তুলে দেওয়া।
  • উৎপাদন ব্যবস্থা ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।

৬. আন্তর্জাতিকতা

মার্কস এবং এঙ্গেলস "কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো"তে আন্তর্জাতিক বিপ্লবের আহ্বান জানান। তারা বিশ্বাস করতেন যে, শ্রমিক শ্রেণী যদি একত্রিত হয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে আন্দোলন করে, তবে তারা পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারবে।

  • তারা বলেন, "প্রলেতারিয়েতের কোনো দেশ নেই", অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণী সব দেশের জন্য একত্রিত এবং একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে।

কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর প্রভাব এবং গুরুত্ব

১. সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের ভিত্তি

কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো আধুনিক সমাজতন্ত্র এবং কমিউনিজমের ভিত্তি স্থাপন করেছে। এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমিক আন্দোলন এবং বিপ্লবের প্রেরণা যুগিয়েছে।

  • এটি শ্রমিক শ্রেণীকে একত্রিত করার জন্য একটি শক্তিশালী দলিল হিসেবে কাজ করেছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনে সহায়তা করেছে।

২. পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সমালোচনা

মার্কস পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শোষণমূলক চরিত্র এবং শ্রমিকদের সঙ্গে এর সম্পর্ক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

  • তিনি পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং এর অন্তর্নিহিত শোষণকে তুলে ধরেছেন, যা পরবর্তীতে শ্রমিক আন্দোলন ও বিপ্লবের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি ছিল।

৩. বিপ্লবের আহ্বান

"কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো" পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে বিপ্লবের আহ্বান জানিয়েছে এবং শ্রমিক শ্রেণীকে তার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা দিয়েছে।

  • এটি শ্রমিকদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করেছে এবং বিশ্বব্যাপী বিপ্লবী আন্দোলন শুরু করতে সহায়ক হয়েছে।

উপসংহার

কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলিল যা বিশ্বব্যাপী শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন এবং বিপ্লবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি পুঁজিবাদী শোষণ এবং শ্রেণী সংগ্রামের ধারণাকে বিশ্লেষণ করে, এবং সমাজে একটি শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছে। এর মাধ্যমে মার্কসিয় দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম, এবং শ্রমিক আন্দোলনের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।


Q10. কার্ল মার্কসের "ক্যাপিটাল" (Capital) এবং "সারপ্লাস ভ্যালু" (Surplus Value) তত্ত্বের আলোচনা

কার্ল মার্কসের "ক্যাপিটাল" (Capital) হলো তার অন্যতম প্রধান দার্শনিক কাজ, যা প্রথমবার প্রকাশিত হয় ১৮৬৭ সালে। এই গ্রন্থে মার্কস পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিশ্লেষণ করেছেন এবং তার মৌলিক তত্ত্বগুলি তুলে ধরেছেন। মার্কসের মতে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি হলো শ্রমের শোষণ এবং লাভের উৎপত্তি। তার "সারপ্লাস ভ্যালু" (Surplus Value) তত্ত্বটি এই শোষণ প্রক্রিয়ার মূল ধারণা।

১. পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মৌলিক ধারণা (Basic Concepts of Capitalism)

মার্কস তার ক্যাপিটাল গ্রন্থে পুঁজিবাদী অর্থনীতি কীভাবে কাজ করে, তা বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রধানত দুই শ্রেণীর মধ্যে গড়ে ওঠে:

  • পুঁজিপতি (Bourgeoisie): যারা উৎপাদন উপকরণ (যেমন কারখানা, জমি, মেশিন, এবং অন্যান্য সম্পদ) এবং অর্থের মালিক। তারা শ্রমিকদের শ্রমের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করে।
  • শ্রমিক (Proletariat): যারা তাদের শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে, কিন্তু তাদের মালিকানা কিছুই নেই, অর্থাৎ তারা উৎপাদন উপকরণের মালিক নয়।

মার্কসের মতে, পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক শ্রেণী তার শ্রম বিক্রি করে, কিন্তু সেই শ্রমের পুরো মূল্য তাকে দেওয়া হয় না। পুঁজিপতিরা তার শ্রমের মাধ্যমে আরও বেশি মুনাফা অর্জন করেন। এই শোষণই হলো পুঁজিবাদের মূল ভিত্তি।

২. সারপ্লাস ভ্যালু (Surplus Value) এর ধারণা

মার্কসের "সারপ্লাস ভ্যালু" তত্ত্ব হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শোষণের মূল উপাদান। এটি বুঝায় যে, শ্রমিকরা যে মূল্য তৈরি করে, তার একটি বড় অংশ পুঁজিপতি লাভ হিসেবে গ্রহণ করেন। সারপ্লাস ভ্যালু বলতে বুঝানো হয় যে, একটি শ্রমিকের শ্রমের মাধ্যমে উৎপন্ন মোট মূল্যের সাথে তার যে পরিমাণ মজুরি (বা পারিশ্রমিক) দেওয়া হয়, তার মধ্যে যে অতিরিক্ত মান (value) থাকে, সেটি পুঁজিপতি দখল করে নেয়।

সারপ্লাস ভ্যালুর উৎপত্তি এবং হিসাব:

মার্কসের মতে, শ্রমিকরা দৈনিক একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাজ করে, যেমন ধরুন ৮ ঘণ্টা। তবে, এই ৮ ঘণ্টার মধ্যে, শ্রমিকের কাজের ফলস্বরূপ উৎপাদিত মোট মূল্যের কিছু অংশ শ্রমিক নিজে পায় (এটি তার মজুরি)। কিন্তু, শ্রমিকের কাজের মাধ্যমে যে অতিরিক্ত মূল্য (যা তার মজুরি থেকে বেশি) উৎপন্ন হয়, তা পুঁজিপতি গ্রহণ করে, যা সারপ্লাস ভ্যালু বা অতিরিক্ত মূল্য নামে পরিচিত। এটি সরাসরি পুঁজিপতির লাভ হিসেবে চলে যায়।

উদাহরণ:

ধরা যাক, একটি কোম্পানির একজন শ্রমিক ৮ ঘণ্টা কাজ করছে, এবং তার দৈনিক মজুরি হলো ৫০০ টাকা। তবে, সে ৮ ঘণ্টা কাজ করার মাধ্যমে মোট ১০০০ টাকা মূল্যের পণ্য উৎপন্ন করেছে। এখন, ৫০০ টাকা শ্রমিকের মজুরি হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বাকী ৫০০ টাকা পুঁজিপতি লাভ হিসেবে গ্রহণ করছে। এই ৫০০ টাকা হলো সারপ্লাস ভ্যালু, যা শ্রমিকের মজুরির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ।

৩. পুঁজিবাদী শোষণ এবং সারপ্লাস ভ্যালুর প্রভাব

মার্কসের মতে, সারপ্লাস ভ্যালু উৎপাদনের প্রক্রিয়া পুঁজিবাদী শোষণের মূল উপাদান। কারণ, পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের পরিশ্রমের মাধ্যমে অতিরিক্ত মূল্য অর্জন করে এবং এটি তাদের মুনাফা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এই শোষণ সিস্টেমে, পুঁজিপতি যত বেশি উৎপাদন উপকরণের মালিক হবে এবং শ্রমিকদেরকে যত কম মজুরি দেবে, তত বেশি সারপ্লাস ভ্যালু অর্জন করবে।

মার্কস বলেছিলেন যে, এই পদ্ধতি যতদিন চালু থাকবে, ততদিন পুঁজিবাদী সমাজে শোষণ অব্যাহত থাকবে। এবং এই শোষণ সমাজে অর্থনৈতিক অস্থিরতা, শ্রেণী বৈষম্য এবং সামাজিক সংঘর্ষ সৃষ্টি করবে। মার্কস বিশ্বাস করতেন যে, এক সময় শ্রমিক শ্রেণী এই শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে এবং একটি নতুন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে উৎপাদন উপকরণ থাকবে শ্রমিক শ্রেণীর হাতে এবং সারপ্লাস ভ্যালু উচ্ছেদ হবে।

৪. সারপ্লাস ভ্যালু এবং পুঁজিপতির মুনাফা

পুঁজিপতি লাভ বা মুনাফা অর্জন করেন মূলত সারপ্লাস ভ্যালুর মাধ্যমে। শ্রমিকের কাজের মূল্য এবং তার মজুরির মধ্যে পার্থক্যই হলো সেই লাভ যা পুঁজিপতি পান। পুঁজিপতির লাভ মূলত "অতিরিক্ত মূল্য" বা সারপ্লাস ভ্যালু থেকে আসে। এর মাধ্যমে পুঁজিপতিরা তাদের সম্পদ বৃদ্ধি করেন এবং সমাজে শোষণের চক্র চলতে থাকে।

৫. পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের স্বভাব

মার্কস "ক্যাপিটাল" এ পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের যে বিশ্লেষণ দিয়েছেন, তা অনুযায়ী, সারপ্লাস ভ্যালু অর্জন শুধু পুঁজিপতির মুনাফার উৎস নয়, বরং এটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যও। অর্থাৎ, সারপ্লাস ভ্যালু ছাড়া পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না। এই শোষণের সিস্টেম যত বেশি সময় ধরে চলবে, ততই সমাজে বৈষম্য এবং শ্রেণী বিভাজন বাড়বে।

উপসংহার

কার্ল মার্কসের "ক্যাপিটাল" গ্রন্থ এবং "সারপ্লাস ভ্যালু" তত্ত্ব পুঁজিবাদী শোষণ এবং শ্রমিকদের সাথে পুঁজিপতির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছে। সারপ্লাস ভ্যালু হলো পুঁজিবাদী অর্থনীতির মূল ভিত্তি, যা শ্রমিকদের শ্রমের মাধ্যমে উৎপন্ন অতিরিক্ত মূল্যের মাধ্যমে পুঁজিপতি লাভ অর্জন করেন। মার্কসের মতে, এই শোষণ চিরকাল চলতে থাকলে একটি সামাজিক বিপ্লবের প্রয়োজন হয়ে পড়বে, যেখানে শ্রমিক শ্রেণী নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে এবং শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে।


Q11. মন্টেস্কিউ-এর "ফর্মস অফ গভর্নমেন্ট" (Forms of Government)

চার্লস-লুই মঁতেস্কিউ (Charles-Louis Montesquieu) একজন ফরাসি দার্শনিক এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ছিলেন, যিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ "দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ" (The Spirit of the Laws) (১৭৪৮) -এ সরকারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের কাঠামো সম্পর্কে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। মঁতেস্কিউ সরকারের তিনটি প্রধান রূপ বা শ্রেণী চিহ্নিত করেছেন, যা সমাজে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে।

মন্টেস্কিউ-এর সরকারের তিনটি প্রধান রূপ:

১. প্রজাতন্ত্র (Republic) ২. রাজতন্ত্র (Monarchy) ৩. নিরঙ্কুশ শাসন (Despotism)

এগুলি মঁতেস্কিউ-এর রাষ্ট্র তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং তিনি এই তিনটি সরকারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য, কার্যকারিতা এবং উপযুক্ততা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

১. প্রজাতন্ত্র (Republic)

প্রজাতন্ত্র হলো একটি এমন সরকারব্যবস্থা, যেখানে জনগণ বা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে ক্ষমতা পরিচালিত হয়। এটি গণতান্ত্রিক বা আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচনা হিসেবে দেখা যেতে পারে। মঁতেস্কিউ-এর মতে, প্রজাতন্ত্রের দুটি প্রধান রূপ রয়েছে:

  • ডিরেক্ট ডেমোক্রেসি (Direct Democracy): যেখানে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। উদাহরণস্বরূপ, প্রাচীন গ্রীসের শহর রাষ্ট্র (এথেন্স) ছিল এমন একটি উদাহরণ।

  • প্রতিনিধি গণতন্ত্র (Representative Democracy): যেখানে জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচন করে, এবং এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশগুলি, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন, এর উদাহরণ।

প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য:

  • শুভবোধ বা গুণাবলি (Virtue): প্রজাতন্ত্রের সফল পরিচালনা সম্ভব কেবলমাত্র যদি জনগণ গুণাবলীসম্পন্ন হয় এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ থাকে। জনগণের মধ্যে উচ্চ নৈতিক মূল্যবোধ থাকতে হবে, যাতে তারা সাধারণ মঙ্গলসাধনের জন্য কাজ করে।
  • জনগণের অংশগ্রহণ: এখানে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন, যাতে তারা নির্বাচনে ভোট দেয় এবং শাসনব্যবস্থায় যুক্ত হয়।
  • আইনের শাসন: প্রজাতন্ত্রে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সঠিকভাবে তার প্রয়োগ হতে হবে।

২. রাজতন্ত্র (Monarchy)

রাজতন্ত্র হলো একটি এমন সরকারব্যবস্থা, যেখানে একজন শাসক, সাধারণত রাজা বা রাণী, ক্ষমতা পরিচালনা করেন। তবে, রাজতন্ত্রে শাসক এককভাবে পুরো ক্ষমতার অধিকারী হন না, বরং তার কিছু বিধি-নিষেধ এবং সীমাবদ্ধতা থাকে। এই সীমাবদ্ধতাগুলি শাসকের কর্তৃত্বকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন সংবিধান বা আইন যা রাজত্বের পরিসীমা নির্ধারণ করে।

রাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য:

  • গৌরব (Honor): রাজতন্ত্রের সঠিক কার্যকারিতা depends করে রাজা বা শাসকের গৌরবের উপর। রাজা যদি তার সম্মান এবং মর্যাদা বজায় রাখেন, তবে রাজ্য সুশাসিত থাকবে।
  • রাজকীয় কর্তৃত্ব: রাজাকে অনেক সময় অত্যন্ত ক্ষমতাবান এবং আধিপত্যশালী হিসেবে দেখা যায়, তবে তার শাসনকালে কিছু নিয়ম এবং প্রতিষ্ঠিত আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়।
  • নির্বাচিত শাসক: রাজ্যটি উত্তরাধিকারসূত্রে পরিচালিত হয়, যেখানে রাজ্যের শাসক নির্বাচিত হয় এবং রাজত্বের ক্ষমতা তার বংশে চলে আসে।

রাজতন্ত্রের উদাহরণ: ইংল্যান্ডের রাজতন্ত্র, যেখানে রাজা বা রাণী একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে শাসন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী সরকার পরিচালনা করেন।

৩. নিরঙ্কুশ শাসন (Despotism)

নিরঙ্কুশ শাসন হলো একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে এক ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠী পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী এবং তারা অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং স্বেচ্ছাচারীভাবে শাসন করে। এই শাসনে জনগণের কোনো স্বাধীনতা বা রাজনৈতিক অধিকার থাকে না, এবং শাসক নিজের ইচ্ছামতো আইন তৈরি করে এবং তার কার্যক্রম পরিচালনা করে।

নিরঙ্কুশ শাসনের বৈশিষ্ট্য:

  • ভয় ও শক্তি: নিরঙ্কুশ শাসকের শাসন চলে প্রধানত ভীতি এবং শক্তির মাধ্যমে। শাসক জনগণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখেন, এবং তার শাসনকে প্রশ্ন করা বা প্রতিবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
  • স্বেচ্ছাচারীতা: শাসক কোনো বিধি-নিষেধের অধীন থাকেন না, তার ইচ্ছাই আইন হয়ে ওঠে। আইন প্রণয়ন, বিচার, এবং প্রশাসন সবকিছু শাসকের হাতে থাকে।
  • সামাজিক ও রাজনৈতিক নিপীড়ন: নিরঙ্কুশ শাসনে জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা অত্যন্ত সীমিত থাকে, এবং শাসক জনগণের প্রতি অত্যাচার ও নিপীড়ন চালায়।

নিরঙ্কুশ শাসনের উদাহরণ: প্রাচীন কাল থেকে বিভিন্ন একনায়ক শাসক, যেমন লুই ১৪ (ফ্রান্সের রাজা), রাশিয়ার জার বা চীনের সম্রাটরা এই ধরনের শাসনব্যবস্থার উদাহরণ।

মন্টেস্কিউ-এর শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বিশ্লেষণ

মন্টেস্কিউ-এর মতে, প্রতিটি সরকারের সফলতা এবং স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি এবং সেই সমাজের মানুষদের গুণাবলীর উপর। তিনি মনে করেন, একটি উপযুক্ত শাসনব্যবস্থা নির্বাচিত করা এবং তাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি "আইনের আত্মা" (Spirit of the Laws) বইয়ে বিভিন্ন সরকারব্যবস্থা এবং তাদের পরিচালনার পদ্ধতি বিশ্লেষণ করেছেন।

মন্টেস্কিউ সরকারের তিনটি ধরনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন রাজতন্ত্র এবং প্রজাতন্ত্র-এর মধ্যে সংমিশ্রণকে। তিনি মনে করেন, রাজতন্ত্র একটি মধ্যপথ হতে পারে, যেখানে শাসকের কর্তৃত্ব এবং জনগণের অংশগ্রহণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়।

মন্টেস্কিউ এর রাষ্ট্র তত্ত্বে আইন, ব্যক্তি স্বাধীনতা, এবং সরকারের সঠিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা এবং ব্যবস্থাপনায় গভীর প্রভাব ফেলেছেন।

উপসংহার

মন্টেস্কিউ-এর "ফর্মস অফ গভর্নমেন্ট" তত্ত্ব রাজনৈতিক শাসন এবং সরকারের গঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। তিনি তার বিশ্লেষণে তিনটি প্রধান সরকারব্যবস্থা চিহ্নিত করেছেন: প্রজাতন্ত্র, রাজতন্ত্র, এবং নিরঙ্কুশ শাসন। তার মতে, সমাজের রাজনৈতিক এবং সামাজিক কাঠামোতে ভারসাম্য রাখতে হলে, শাসনব্যবস্থার রূপ এবং এর কার্যকারিতা সম্পর্কে গভীর বিশ্লেষণ এবং জনগণের গুণাবলীর ভিত্তিতে শাসন পরিচালনা করা জরুরি।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

Political Sociology ( Salima Jannath Lyra )

Bepari sir - Politics and Governance in South Asia